কেন বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকদের অভাব? কেন তারা এদেশে আসতে চায়না?

বেশ কিছুদিন আগের একটা খবর আমাকে খুবই হতাশ করেছে। খবরটি ছিল এক বিদেশী নারী পর্যটককে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। যাক উনার ভাগ্য ভাল যে, উনি বেঁচে গিয়েছেন এবং পুলিশ তাকে ঠিক সময়মত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ ধরনের ঘৃণিত ঘটনা এর আগে ঘটেছিল কিনা এখানে তা আমার জানা নেই। তবে আমি জানি যে, এইরকম ঘটনা আগে কখনই ঘটেনি এবং যারা এদেশে ঘুরতে এসেছিলেন তারা অনেক সুখস্মৃতি নিয়েই ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু এখন যা ঘটলো তার ফলে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ হবে এবং ভবিষ্যতে বিদেশী পর্যটকগণ এদেশকে অনিরাপদ মনে করতে পারেন। যেমনটা ভারতে হয়েছে, যেখানে যাবার আগে পর্যটকগণ ১০ বার চিন্তা ভাবনা করেন কারণ এখানে নারী পর্যটক ধর্ষণের মত ঘৃণিত ঘটনা আগে অনেকবার ঘটেছে। কিন্তু তারপরও সেখানে পর্যটকগণ যাচ্ছে, কারণ আমরা জানি যে ভারত একটি বৈচিত্রময় দেশ এবং এখানে সব জায়গা একরকম নয়। সেখানে আমাদের বৈচিত্রতা এবং পর্যটনকেন্দ্র খুবই কম। তারপরও আমাদের ভাবমূর্তি অতটা খারাপ ছিল না কখনই, অন্তত নিরাপত্তার ব্যাপারে। কিন্তু ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া হলি আর্তিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর এদেশে পর্যটকদের সংখ্যা অনেক হারে কমিয়ে দিয়েছে। যখন আমরা আমাদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছি ঠিক তখনই ঘটে গেল এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা। যার ফলে পর্যটকদের সংখ্যা আরো কমবে। আর সেদিনকার ঘটনা, খবরে পেলাম যে এক ফরাসি পর্যটককে ভালমত হয়রানি করা হচ্ছিল। পরে অবশ্য শুনেছি পুলিশ সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে।

Screenshot_2020-02-22 টেকনাফে অশ্লীল কথা বলে বিদেশি পর্যটককে হেনস্থাকারী সেই যুবক আটকScreenshot_2020-02-22 কক্সবাজারে রিসোর্টে অস্ট্রেলিয়ান নারীকে কর্মচারীদের ধর্ষণের চেষ্টা

এসব খবর শুনে বাংলাদেশী হিসেবে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়।

কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুই কিন্তু মূল কারণ নয় এখানে বিদেশী পর্যটক কম আসবার। আরো অনেক কারণ আছে যার জন্যে কেউ এখানে আসতে চায়না। এগুলো আমার নিজের উপলব্ধি থেকে বলছি। আমি দেশের প্রায় ৬০টির মত জেলা এবং দেশের বাহিরে প্রায় ১১ টির মত দেশ ঘুরে এই উপলব্ধিগুলো করেছি। আমাদের দেশ কিন্তু পৃথিবীর মাঝে এক অন্যরকম দেশ, আমাদের যা আছে তা দুনিয়াতে আর অন্য কোথাও নেই। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, কুয়াকাটা ইত্যাদি একেকটি উদাহরণস্বরূপ। কিন্তু এসব স্থানগুলো আমরা ধীরে ধীরে নষ্ট করছি। এসব স্থানগুলো নেই আন্তর্জাতিক মহলে কোন সঠিক কোন প্রচার প্রচারণা। তাই আজ কথা হবে কেন বিদেশী পর্যটকগণ বাংলাদেশে আসতে চান না। এর কারণ এবং এর থেকে উত্তরণ সম্পর্কে আলোচনা হবে।

কেন বিদেশী পর্যটকরা এদেশে আসতে চান না?

প্রচারনার অভাব 

বিদেশী পর্যটক না আসার প্রধান কারণ হল এদেশে পর্যটনের বিকাশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোন রকমের প্রচার প্রচারণা নেই। এবং এই নিয়ে সরকার এবং দেশের সাধারণ জনগণের কোন প্রকার মাথাব্যাথা নেই। প্রথম কথা হল যে, যদি বিদেশিরা এই দেশের কোন কিছু সম্পর্কে নাই জানে বা এই দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো সম্পর্কে না জানে তাহলে তারা এদেশে আসবে কেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু লোক মনে করেন যে, বাংলাদেশ ভারতের কোন অঙ্গরাজ্য হবে। বিভিন্ন দেশে গিয়ে আমার দেশ সম্পর্কে পরিচয় দিতে এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তারপরেও কিছু রোমাঞ্চপ্রিয় বিদেশী পর্যটক এখানে আসেন এবং এদেশকে ভালভাবে ঘুরে দেখবার চেষ্টা করেন। তারা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখবার পর সবাই একই কথা বলেন যে, এইসব স্থান সম্পর্কে কোন সঠিক প্রচার প্রচারণা নেই। আগে তারা কখনই এসব স্থান সম্পর্কে জানতেন না এবং তারা এটাও বলেন যে, সঠিক প্রচারণা হলে এসব স্থানে আরো বেশি পর্যটক সমাগম হবে। আসলেও কতজন পর্যটক জানেন যে, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে একই দিকে সূর্য উদয় হয় এবং একই দিকে অস্ত যায়? কতজনই বা জানেন যে, এদেশে গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতের মত গ্রিন কার্পেট সী বিচ এদেশে আছে? বান্দরবনের নাফাখুম বা আমিয়াখুমের প্রবল স্রোতশালী ঝর্ণাধারার কথা বা সাজেকের মেঘের সমুদ্রের কথা কতজনই বা জানেন?কেউ যদি এ সম্পর্কে নাই জানে তবে কে এখানে আসবে? এখানে প্রচার প্রচারণার বড়ই অভাব দেখা যাচ্ছে যেখানে আমাদের পাশের দেশ ভারত কিংবা থাইল্যান্ড তাদের প্রতিটি আকর্ষণীয় স্থানগুলোকে নিয়ে সবসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে।

বাজে যাতায়াত ব্যবস্থা

এখানে যদি কোন বিদেশী আসেন তবে তিনি সর্বপ্রথম এদেশের বাজে যাতায়াত ব্যবস্থার শিকার হন। আমরা আমাদের দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানি যে, এদেশে যাতায়াত ব্যবস্থা কতটা খারাপ। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এরকম বাজে অবস্থার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। কিন্তু বিদেশী পর্যটকগণ এটা মেনে নেবে। যদি আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে তাদের নজরে দেখি তবে ইংরেজীতে বলতে হবে “It Sucks”। অত্যন্ত বাজে। আমরা যখন আমাদের দেশের বাড়িতে যেসকল বাসে বা গণপরিবহনে যাতায়াত করি সেগুলোর কথা চিন্তা করে দেখেছেন? এখন তারা যদি টাকা খরচ করে এসে এসব পরিবহনে চলাচল করে তাহলে কি তারা আর পরেরবার আসবার কথা চিন্তা করবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, বিদেশী পর্যটক মানেই ধনী পর্যটক নয়। এদেশে যারা ধনী পর্যটক আসবেন তারা হয়তো তাদের নিজস্ব প্রাইভেট পরিবহনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবেন কিন্তু যারা বাজেট লেভেলের ট্রাভেলার তারা তো এখানে এসে নানান ঝামেলার মধ্যে পরবেন। আমরা যখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চায়না, জাপান বা অন্যান্য দেশে ঘুরতে যাই তখন আমরা সেদেশের গণপরিবহন ব্যবহার করবার চেষ্টা করি যাথে আমরা খরচ সাশ্রয় করতে পারি। তখন আমরা দেখি যে, বিদেশী পর্যটকগণও এই গণপরিবহন ব্যবহার করছে। কিন্তু সেদেশের গণপরিবহনে আমরা যেরকম সার্ভিস পাই আর আমাদের দেশে! এটা সবার জানা কথা। তাহলে বাজেট লেভেলের ট্রাভেলাররা কিজন্য এদেশে আসবেন। আর আমাদের গণপরিহনগুলোতে যাত্রীদের কোন ধরণের নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। লোকাল বাসের হেল্পাররা তো পারলে আমাদের গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলেই দেন। আর হাইওয়ে রোডের বাস ড্রাইভাররা যে কি তা আমরা সকলেই জানি। এদেশে রেলওয়ে সার্ভিসের সুনাম একসময়ে ছিল। কিন্তু সেখানেও যাত্রীদের নিরাপত্তার মান অনেক কমে গিয়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে রেল দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর ট্রেনে বিভিন্ন ধরণের অপরাধী গ্রুপের আনাগোনা, যাত্রীদের টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠে অযথা ভিড় করা, চলার পথে ট্রেনের গ্লাস লক্ষ্য করে ঢিল মারা এসব তো আছেই। এরকম অনিরাপত্তার মধ্যে কে এসবে যাতায়াত করবে! আপনারাই বলুন। এগুলো ছাড়া আর অন্যান্য যে অপশনসমূহ আছে তা খুবই ব্যয়বহুল। যেমন বলি যে, ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমান ভাড়া ওয়ানওয়ে প্রায় ২৯০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত উঠানামা করে। কিন্তু আপনি যদি থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রুটের প্লেন ভাড়া দেখেন তবে আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম পরবে। আমি যখন মালয়েশিয়া ঘুরতে যাই তখন আমার কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাউই ভাড়া পরেছে আপ-ডাউন প্রায় ৪২০০ টাকার মতন। তার কিছুদিন আগে কক্সবাজার যাই, তখন ওয়ানওয়ে ভাড়া লেগেছিল ৪৩৫০ টাকা। দু যাত্রায় সময় লেগেছিল এক ঘণ্টার মত। তাহলে বলুন যে কোথায় যাওয়া ভাল? কক্সবাজারে যদি আমি এসি বিজনেজ ক্লাস বাস ভাড়ার কথা চিন্তা করি তবে আপ-ডাউন মিলিয়ে প্রায় ৪০০০ টাকার মত খরচ হত। তাহলে এটা কি ব্যয়বহুল নয়? আবার সাজেকের কথা যদি ধরি তবে, খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে জীপ গাড়ি বা চান্দের গাড়িতে ভাড়া আপ-ডাউন প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মতন। এখানে তো সবাই গ্রুপ করে যায়। কিন্তু বিদেশীরা কি সবসময় লম্বা গ্রুপ নিয়ে এদেশে আসবে? যদি না আসে তবে এটা তাদের জন্য কি বেশি খরচ নয় কি? আপনি ভেবে দেখুন যদি আপনি একা সাজেক যান তবে আপনার খরচ কত পরে! আবার এখানে যাবার জন্য শুনেছি বিদেশিদের আলাদাভাবে অনুমতি নিতে হয়।যদি এটা হয় তবে এটা একটা ভোগান্তিকর ব্যাপার হবে একজন বিদেশী পর্যটকের জন্য এদেশে। এরকম পরিবহন ব্যবস্থা এদেশের আরও অনেক স্থানেই এক। কোন পর্যটন এলাকায় যদি অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না হয় তবে সেখানে পর্যটকরা আসবে কেন?

বাজে আবাসন ব্যবস্থা

আমাদের কথাই চিন্তা করে বলি, আমরা যখন বিদেশে যাই তখন সাধারণত কম খরচে ভাল কোন হোটেল নেবার চেষ্টা করি। সাধারণত থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়াতে ঘুরতে গেলে আমরা ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে ভাল রুম পেয়ে থাকি যাতে মোটামুটি সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা থাকে। যদিও মাঝে মাঝে কিছু বেশকম হয়। তারপরেও অধিকাংশ সময়ে আমরা ভাল আবাসনই পেয়ে থাকি। এখন চিন্তা করুন যে দেশের মধ্যে এই একই খরচে আমরা কি সুযোগ সুবিধা পাই! কাদের আবাসন ব্যবস্থা ভাল? ওদের না আমাদের? উত্তর আশা করি যে ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন। তবে একজন বিদেশী যদি এগুলো নিয়ে রিসার্চ করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তবে সে কোথায় যাবে বা কোথায় তার যাওয়া উচিত ? এর উত্তরও নিশ্চই আপনাদের জানা। কক্সবাজারে তাও আবাসন ব্যবস্থা মোটামুটি ভাল। কিন্তু চিন্তা করুন কুয়াকাটা, সিলেট, সাজেক কিংবা অন্য কোথাও। সেখানে কি অবস্থা ভেবে দেখেছেন কি? সেখানকার জায়গাগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর কিন্তু একজন বিদেশী সেখানে গেলে থাকবেন কোথায়। তারপরেও যখন হোটেলওয়ালারা কোন বিদেশী টুরিস্টকে পান, তাদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করেন। অনেকে বলবেন যে,বাংলাদেশে ফাইভ স্টার হোটেলেরতো অভাব নেই। ভাই, বিদেশী মানে যে সবাই বড়লোক তা নয়। থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়াতে ম্যাক্সিমাম বাজেট ট্রাভেলাররাই বেড়াতে যান। এবং তারা বিশ্বের সকল বাজেট ট্রাভেলারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবার জন্যেই তাদের টুরিজম শিল্প অনেক শক্তিশালী, যা তাদের গোটা অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। আমাদের দেশে বিশ্বের বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য মানসম্মত কোন আবাসন ব্যবস্থা নেই। যারা এখানে আসছেন তাদের সবাই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এখানে আসছেন। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এদের আবাসন খরচ বহন করতে হয়।

নোংরা পরিবেশ

এটা তো সকলেরই জানা কথা যে, আমরা এদেশের প্রাকৃতিক দূষণের জন্য নিজেরাই দায়ী। আর কোথাও ঘুরতে গেলে আমরা সেখানকার পরিবেশের কথা একটুও চিন্তা করি না। বরং যেভাবে পারি সেভাবে পরিবেশের বারোটা বাজাই। খোলা স্থানে আমরা কি ফেলে দেইনা? পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, ফলের খোসা, সিগারেটের ফিল্টার এবং অন্যান্য নানা রকমের ময়লা আবর্জনা আমাদের টুরিস্ট স্পটগুলোতে দেখা যায়। প্রায় সবসময়ই আমাদের ময়লা আবর্জনার স্তূপের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয় সেসকল স্থানে। এ যদি এখানকার পরিবেশগত অবস্থা হয় তবে, এখানে কে আসবে। বিদেশীরা সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করে। তাই এখানে যারা আসবে তাদের বেশীরভাগই দ্বিতীয়বার আসবার কথা মাথায় তুলবেন না। থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ার কথা চিন্তা করুন, তারা কি সুন্দর তাদের টুরিস্ট স্পটগুলোকে গুছিয়ে রেখেছে। পাশের দেশ ভারতের কথা চিন্তা করে দেখুন। যে দেশ স্যানিটেশনে আমাদের চেয়ে অনেক পিছনে সেই দেশ কিন্তু তাদের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঠিকই গুছিয়ে রেখেছে। গরীব দেশ কম্বোডিয়ার কথা চিন্তা করুন। যাদের অর্থনীতি আমাদের চেয়েও অনেক দুর্বল। যেখানে নিজেদের কোন মুদ্রা ব্যবস্থা নেই। তারা পর্যটন দিয়ে তাদের দেশকে অগ্রগতির দিকে ঠেলবার চেষ্টা করছে। সেখানেও পর্যটনকেন্দ্রগুলো অনেক পরিচ্ছন্ন ও সাজানো গোছানো। সেখানে পর্যটকদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে এবং আমাদের কমছে। খাবারের হোটেল্গুলোর মান যথেষ্ট খারাপ আমাদের দেশে। সেখানে হাইজিনের কথা চিন্তা করা হয় না। স্ট্রিট ফুডের কথা আর নাই বা বললাম। আমরা না হয় এসব খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু আমাদের দেশের খাবার খেয়ে যদি কোন বিদেশির সমস্যা হয়, তবে এদেশের পর্যটন শিল্পের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে না? কেউকি তখন আসতে চাইবে? সাউথ-ইষ্ট এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখেছি স্ট্রিট ফুড বানানো বা পরিবেশনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হাইজিন মেন্টেন করা হয়। আর এখানে এমনিতেই পরিবেশ ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ, তারপর আবার হকাররা হাইজিন একেবারেই মেনটেন করে না। তাহলে কেমনে কি? যে এখানে এসে একবার অসুস্থ হবে, সে কি আর অন্য কাউকে বলবে যে এখানে আসো? এবং অনেকেই এখানে এসে অসুস্থ হয়েছেন ঠিকই।

I2I1

Screenshot_2020-02-22 সৈকতে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন পর্যটকেরা

এ হল আমাদের পরিবেশের অবস্থা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

টুরিস্টদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই বাজে। এই ব্লগের শুরুতেই সবার ধারণা হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তারপরেও আরও অনেক উদাহরণ দিচ্ছি। বিদেশী যাত্রীদের এখানে আসবার পর হয়রানি শুরু হয় এয়ারপোর্ট থেকেই। প্রথমে শুরু হয় ভিসা নিয়ে ঝামেলা। বাংলাদেশ সাধারনত উন্নত দেশের নাগরিকদের অন-এরাইভাল ভিসা ইস্যু করে থাকে। কিন্তু সেখানে তাদেরকে অনেক রকম হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেকসময় তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। তবে বর্তমান সময়ে এমনটা হয় না। কয়েকজন বিদেশীদের সাথে কথা বলে জেনেছি। যাই হোক, ৫১ ডলার ভিসা ফি পরিশোধ করে এখন লাগেজ কালেক্ট করার পালা। এইখানে এসে সবচাইতে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয়। অধিকাংশ সময়ে দেখা যায় যে, তাদের লাগেজ লাপাত্তা! বিদেশীদের এমন অভিযোগ অনেক। আমাদের এয়ারপোর্টে লাগেজ চুরির ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার পর ট্রান্সপোর্টেশন নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। ট্যাক্সি ড্রাইভাররা তো বিদেশী পেলে একেবারেই তাদের ওপর রোলার চালাতে প্রস্তুত। অধিকাংশ সময়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে তারা। এধরণের অভিযোগ অনেক শুনেছি, দেখেছিও বটে। কিন্তু এসকল অভিযোগ তদারকি করবার কেউ নেই। এজন্যই অনেকে এদেশকে অনিরাপদ মনে করেন। মাঝে মাঝে কিছু অসাধু টুরিস্ট গাইডরা তাদের নানা রকম বিপাকে ফেলেন। তাছাড়া এদেশে যখন তখন রাজনৈতিক হাঙ্গামা যেভাবে হয়, তা উনারা দেখলে তো অনিরাপদ বোধ করবেন এটাই তো স্বাভাবিক।

Screenshot_2020-02-22 Solo Travelers of Bangladesh

লজ্জাজনক ঘটনা।

যা যা করণীয়

  • প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা যে যেভাবে পারি, যার যার জায়গা থেকে যতটুকু পারি। এক্ষেত্রে আমরা যারা বিদেশ ভ্রমণ করি বা যারা বিদেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছি তাদের ভূমিকাই মূল। বিদেশীদের বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশ ভারতের কোন অঙ্গরাজ্য নয় যা অনেক বিদেশীরা মনে করে থাকেন। ওদের বলতে হবে যে, আমাদের আলাদা জাতিসত্ত্বা রয়েছে এবং আমাদের দেশে দেখবার মত অনেক কিছু আছে। এখানে আমি ভারতীয়দের কোন দোষারোপ করছি না। আমাদের দেশে হাজার খারাপ কর্মকান্ডের মধ্যেও অনেক ভাল কিছু হচ্ছে, সেগুলো প্রচার করতে হবে বেশি বেশি করে।
  • সরকারের উচিত এ দেশে আসবার জন্য ভিসা ব্যবস্থা সহজ করা, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর জন্য। আমাদের দেশে উন্নত দেশের ভ্রমণকারীদের জন্য অন এরাইভ্যাল ভিস ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে ভিসা ফি হিসেবে ৫১ ডলার নেওয়া হয়। এটা খুবই অতিরিক্ত। ইন্দোনেশিয়ার মত দেশে যেখানে আমাদের ভিসা ফ্রি হিসেবে ঢুকতে দেওয়া হয়, সেখানে আমরা ৫১ ডলার নেব এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
  • সরকারের উচিত এদেশের বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটে বিদেশীদের জন্য আলাদা জোন গড়ে তোলা। যেখানে ওদের নিয়মমাফিক সকল সুযোগ-সুবিধা থাকবে। হ্যাঁ বলছি থাইল্যান্ডের মত অত বাড়াবাড়ি কিছু। আর এটাও জানি যে,আমাদের দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সবার আপত্তি থাকবে। সেক্ষেত্রে আমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাজে লাগাতে পারি যাদের এসব ক্ষেত্রে ধর্ম বিপত্তি ঘটবে না। হোটেল আবাসন ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
  • যারা এদেশে আসবেন তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সর্বদা নজর রাখতে হবে। ট্যুর অপারেটর যারা বিদেশীদের ভ্রমণ পরিচালনা করছেন, তাদেরকে কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখতে হবে আইন – শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতে তারা কোন অনিয়ম করতে না পারে।
  • যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি অবশ্যই করতে হবে সরকারকে। এ নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। কারণ, এটা এদেশের সকল মানুষদের জাতীয় দাবি।
  • সরকারের উচিত আমাদের দেশের পাসপোর্টের মান বৃদ্ধি করা। যার ফলে এদেশের ভ্রমণকারীগণ সহজেই বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করতে পারে। যার ফলে এখানকার টুরিস্ট স্পটগুলোর ওপর দেশীয় পর্যটকদের চাপ কমবে এবং বিদেশী পর্যটকদের আসার সুযোগ বৃদ্ধি হবে। সরকারকে এজন্য অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
  • গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্ট স্পটগুলোকে অতি যত্নতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে কেউ এর পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহলকে অনেক বেশি কঠোর হতে হবে। কেউ যদি কোন প্রতিকূল আচরণ করে, তার জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • পরিশেষে, আমাদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে। কোথাও ঘুরতে গেলে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা উচিত নয়। আমাদের দেশের মানুষের আথেতিয়তার ব্যাপারে কোন প্রশ্ন নেই। যেসকল বিদেশিরা এখানে আসেন তারা সবাই এ কথাই বলেন। কিন্তু আমরা মোটেও পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন নই। আমাদের বুঝতে হবে যে, ওরা যত বেশি আসবেন ততই আমাদের পর্যটন শিল্প উন্নত হবে। আমাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন হবে এবং দিনশেষে আমরাই লাভবান হব। তাই সবসময় বলি ও এখনও বলছি যে, যেখানেই ভ্রমণ করুন না কেন সবসময় খেয়াল রাখবেন আপনার জন্য পরিবেশ যাতে নোংরা না হয়। পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের সর্বদা সচেতন থাকা উচিত।

আমার এ লেখা আমার নিজের অনুধাবন থেকে লেখা। দেশ ও দেশের বাহিরে নানান জায়গা ঘুরে এসকল ব্যাপারগুলো উপলব্ধি করেছি। কিছু কিছু ব্যাপারে আপনাদের দ্বিমত থাকতে পারে।

ছবিসূত্র – সংগৃহীত ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s