ভ্যানকুভার – বিশ্বের এক শীর্ষস্থানীয় সৌন্দর্যমন্ডিত শহরের এদিক ওদিক (পর্ব-২)।

ভ্যানকুভার হল কানাডার তৃতীয় এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের সর্ববৃহৎ শহর। আশেপাশের ছোট ছোট শহর যেমন বার্নাবি, সারে, রিচমন্ড, নিউ ওয়েষ্টমিনিস্টার এবং নর্থ ভ্যানকুভারকে সাথে নিয়েই মেট্রো ভ্যানকুভার গঠিত। যেহেতু এই শহরে অনেকগুলো পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে তাই সব কিছুর বর্ণনা একসাথে করলে তা অনেক লম্বা এক প্রবন্ধ হবে। তাই এ প্রবন্ধটিকে ২ পর্বে বিভক্ত করেছি। আগের পর্বের আয়োজন ছিল এই শহরের সুন্দর সুন্দর পার্কগুলোর বর্ণনা নিয়ে। এই পর্বে আপনাদের জানাবো এই শহরের সমুদ্র সৈকতসমূহ এবং পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর সম্পর্কে। ভ্যানকুভার শহরকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিংকে।

https://roamingwithwally.com/2020/09/02/%e0%a6%ad%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%8f%e0%a6%95-%e0%a6%b6%e0%a7%80/

আগের পর্বেই আপনাদের জানিয়েছি যে, পুরো শহরটি সাগর এবং পাহাড়-পর্বত দ্বারা আবৃত এবং এখানকার আবহাওয়া কানাডার অন্যান্য প্রদেশের অঞ্চলগুলো থেকে উষ্ণতর। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মত এখানেও সাগর এবং পাহাড়ের সমন্বয় চোখে লাগার মত। তবে চলুন জেনে নেওয়া যাক, এই শহরের বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়া এবং বিভিন্ন সাগরের পাড় সম্পর্কে।

গ্রুস মাউন্টেন

একে ভ্যানকুভার শহরের চূড়া বলা হয় যা “Peak of Vancouver” নামে সকলের নিকট পরিচিত। উত্তর ভ্যানকুভারে অবস্থিত এই পর্বতটি মূলত এখানে অবস্থিত একটি স্কি রিসোর্টের জন্য বিখ্যাত। শীতকালে এই পুরো পাহাড়ি অঞ্চলটি বরফে ঢাকা থাকে। পুরো উত্তর ভ্যানকুভার শহরটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চল এবং গ্রুস মাউন্টেন হল এর সর্বচ্চো চুড়া যা সমতল ভুমি থেকে প্রায় ৪ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এখানে যেতে হলে আপনাকে উত্তর ভ্যানকুভারের গ্রুস মাউন্টেন কেবল কার স্টেশনে আসতে হবে, তারপর ১৫ মিনিট কেবল কারে চড়ে আপনাকে স্কি রিসোর্ট পৌঁছতে হবে। স্কি রিসোর্টের চারপাশ খুবই সুন্দর এবং ঘুরে দেখবার মত। সেখানে আপনার দেখা হবে কিছু পাহাড়ি ভাল্লুকদের সাথে। রিসোর্ট এরিয়াতে পাহাড়ি ভাল্লুকদের জন্য আলাদা একটি স্থান রয়েছে যা একটি চিড়িয়াখানার মত। এই ভাল্লুকগুলোর আসল বাসস্থান উক্ত পাহাড়ি এলাকার আশেপাশে হতে পারে। রিসোর্ট এলাকাটিতে অনেকগুলো হাইকিং জোন রয়েছে। শীতকালে সেই জোনগুলো স্কিয়িং জোনে রূপান্তরিত হয়। আপনি চাইলে হাইকিং করে পর্বতের মূল চূড়ায় উঠতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রায় ২০০ মিটারের বেশি হাইকিং করতে হবে যা অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার বটে। তবে হাইকিং করে আরোহন করতে না চাইলে আপনি ওপেন কেবল কারে চড়ে উপরে উঠতে পারেন। এই ওপেন কেবল কার চড়ে আসা যাওয়া হবে সবার জন্য খুবই রোমাঞ্ছকর। পর্বতের চূড়া থেকে সমতলে অবস্থিত ভ্যানকুভার শহর এবং এর সাগর ধারাকে পাখির চোখের ন্যায় দেখতে পাবেন। এখানকার আবহাওয়া সবসময় ঠান্ডা থাকে এমনকি গ্রীষ্মকালেও যখন সমতলের তাপমাত্রা উষ্ণ থাকে তখনও এই পর্বতের চূড়ায় তাপমাত্রা অনেক ঠান্ডা থাকে। আবহাওয়া যদি খুবই মেঘলা হয় তবে আপনি সেখান থেকে মেঘ হাতে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারবেন। সবকিছু ঘুরে দেখা হয়ে গেলে আবার কেবল কারে চড়ে নিচে নেমে যেতে হবে এবং যাত্রা করতে হবে শহরের দিকে। কেবল কার স্টেশনে কিছু সুভেনিয়র শপ এবং কফি শপ আছে, চাইলে সেখানে একটি ছোট বিরতি নিতে পারেন। কেবল কারে আসা-যাওয়া এবং প্রবেশ ফি বাবদ আপনাকে খরচ করতে হবে জনপ্রতি ৫৫ ডলার করে। তবে সেখানে যাওয়ার পর ওপেন কেবল কারে চড়তে কোন পয়সা খরচ করতে হবে না। সেখানকার রিসোর্টে চাইলে কয়েকটাদিন থেকে কাটাতে পারেন, কিন্তু তা হবে খুবই ব্যয়বহুল।

পাহাড় চূড়া থেকে ভ্যানকুভার শহর দর্শন।

স্কোয়ামিশ সী টু স্কাই গন্ডোলা

উত্তর ভ্যানকুভার থেকে প্রায় ১ ঘন্টা দূরে অবস্থিত এক ছোট্ট পাহাড়ি শহর স্কোয়ামিশ। এই স্কোয়ামিশ শহরেই ঘুরে দেখবার মত আছে অনেক কিছু। এই শহরটি মেট্রো ভ্যানকুভারের অন্তর্ভুক্ত না হলেও মূলত ভ্যানকুভারে বসবাস্ররত লোকজনই ছুটির দিনে ডে-ট্রিপের জন্য এই শহরটিকে বেছে নেয় এবং এই শহরের মূল আকর্ষণ হল এই সী টু স্কাই গন্ডোলা। এটি মূলত পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি হাইকিং এরিয়া যেখানে ১০ টির মতন ভিন্ন হাইকিং ট্রেইল আছে। এখানে পাহাড় চূড়া থেকে প্যাসিফিক সাগর প্রণালীকে দুচোখ ভরে যতদূর ইচ্ছা ততদূর পর্যন্ত উপভোগ করতে পারবেন যা এর নামের অর্থ বহন করে। তাছাড়াও এখানে যেতে হলে আপনাকে সাগর পারে অবস্থিত কেবল কার বা গন্ডোলাতে চড়ে পাহাড়ের চূড়ায় অবতরন করতে হবে যার জন্য এই স্থানের নাম হয়েছে সী টু স্কাই গন্ডোলা। আনুমানিক ১০ মিনিটের এই কেবল কার রাইডে চড়ে আপনাকে উঠতে হবে প্রায় ৮৮৬ মিটার উঁচুতে। উঁচুতে পৌঁছাবার পর আপনি পৌঁছে যাবেন সামিট লজে। এখানে কিছু সুভেনিয়র শপ এবং একটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এই সামিট লজ থেকেই চোখে পড়বে এই জায়গার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ স্কাই পাইলট সাস্পেনশন ব্রিজ। এই ঝুলন্ত সেতুটি ১০০ মিটার দীর্ঘ এবং দুটি পাহাড়ের প্রান্তকে সংযুক্ত করেছে। এই সেতুতে যেতে হলে ছোট একটা পথ পর্যন্ত হাইকিং করতে হবে। তারপর সেতু পাড় হলেই আবারও আপনি পৌঁছে যাবেন সামিট লজে। এখানে হাইকিং করার জন্য প্রায় ১২ টির মত ট্রেইল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে স্পিরিট ট্রেইল, প্যানারোমা ট্রেইল, শেনন ফলস ট্রেইল এবং স্কাই সামিট ট্রেইল অন্যতম। আমি আমার যাত্রায় স্পিরিট ট্রেইল এবং প্যানারোমা ট্রেইলের মত সহজ ২টি ট্রেইল পার করেছি। সেখানেই আমি অসাধারণ কিছু ভিউ পেয়েছি যা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এ যেন প্রকৃতির এক অসাধারণ সমন্বয়। অদূরে অবস্থিত বরফে ঢাকা পাহাড়, তার নিচে সবুজে ঘেরা পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং একেবারে তলদেশে নীল সাগর প্রণালী এরকম সমন্বয় আগে অন্য কোথাও দেখি নি। অন্যান্য ট্রেইলগুলোতেও আছে দেখার মত অনেক কিছু। তার মধ্যে শেনন ফলস অন্যতম। তবে এর ট্রেইল পাড় করা মোটেও সহজ সাধ্য নয়। প্রথমে নিচে নামতে হবে এবং পরে অনেক উঁচু পথ বেয়ে উঠতে হবে। এই ট্রেইল পারি দিতে আপনার ৩ থেকে ৪ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। এর চাইতেও কঠিন ট্রেইল হল স্কাইলাইন ট্রেইল যা সম্পূর্ণ করতে আপনার ৬ থেকে ৮ ঘন্টা সময় লেগে যেতে পারে। এই ট্রেইল ধরে পৌঁছে যেতে পারেন এই স্থানের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় যেখান থেকে অন্যান্য উঁচু পর্বতচূড়াগুলো খুবই কাছ থেকে উপভোগ করতে পারবেন। আপনার চাওয়ামত ট্রেইল হাইকিং সম্পন্ন হলে সামিট লজে ফিরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। সেখানে একটি রেস্টুরেন্টও রয়েছে। চাইলে সেখানকার ওপেন গ্রাউন্ডে পরিবেশ উপভোগ করতে করতে লাঞ্চ সেরে নিতে পারেন। সব কিছু শেষ হলে এবার ফেরার পালা, আবারও আপনাকে কেবল কারে চড়ে নিচে নেমে শহরের পথে রওনা দিতে হবে। এখানেও কেবল কার স্টেশনে কিছু সুভেনিয়র শপ ও ক্যাফে রয়েছে। ফেরাযাত্রার আগে এখানে ছোট একটা বিরতি নিলে খারাপ হবে না। এই ট্রেইলিং এরিয়াতে যেতে কোন প্রবেশ ফি নেই। কিন্তু কেবল কারে আসা-যাওয়া বাবদ আপনাকে প্রায় ৬০ ডলারের মত খরচ করতে হবে।

স্প্যানিশ ব্যাংক বিচ/ জেরিকো বিচ

শহরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত শহরবাসীদের মূল অবকাশ কেন্দ্র হল এই সমুদ্র সৈকত। স্প্যানিশ ব্যাংক বিচ ও জেরিকো বিচের অবস্থান পাশাপাশি হওয়ার কারণে দুটো বিচ মিলে এক চওড়া সী বিচের সৃষ্টি হয়েছে যা অনেকটা আমাদের দেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মত। তবে মূল পার্থক্য হল কক্সবাজার সৈকতের অবস্থান একেবারে মূল সাগরের ধারে এবং এর অবস্থান সাগর প্রণালীর ধারে যেখান থেকে আপনি উত্তর ভ্যানকুভার শহর এবং রিচমন্ড শহরের কিছু অংশ পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন। শহরের লোকজন সাধারণত সপ্তাহশেষে এখানে পরিবার পরিজন নিয়ে অবকাশ যাপনের জন্য আসেন। গ্রীষ্মকালে এখানে একটু বেশিই ভিড় লক্ষ্য করা যায়। সবাই এখানে নানা বিনোদনমূলক কাজে ব্যস্ত থাকে। কেউ কেউ কায়াকিং ও জেটস্কি রাইডিং করছেন, কেউ কেউ আবার চওড়া বিচের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আপনি চাইলে কায়াকিং করে সাগর প্রণালীর অপরপ্রান্তে যেতে পারবেন যখন পানির উচ্চতা কম থাকবে। তবে অনেকে এখানে যেজন্য আসেন তা হল মাছ এবং কাঁকড়া ধরার জন্য। জেরিকো বিচের প্রায় একেবারে শেষ প্রান্তে ফিশিং এর জন্য একটি কাঠের তৈরি ডক রয়েছে যেখানে সবাইকে বড়শি হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। তবে কাঁকড়া ধরতে হলে একটি নির্দিষ্ট সাইজের চেয়ে ছোট কাঁকড়া ধরা একেবারেই নিষিদ্ধ। সেরকম কাঁকড়া জালে ধরা পড়লে তা আবার সাগরে ফেলে দিতে হয়। এই বিচের আশেপাশে অনেক সুন্দর সুন্দর পার্ক রয়েছে। সেই পার্কগুলোতে সবাইকে বনভোজন করতে দেখা যায়। অনেককে ওয়াকিং বা সাইক্লিং করতে দেখা যায়। ওয়াকিং ও সাইক্লিং এর জন্য আলাদা আলাদা ট্রেইল রয়েছে। যেখানে জেরিকো বিচ শেষ হয়েছে, সেখানে থেকে একটি ওয়াকিং ট্রেইল শুরু হয়েছে। ট্রেইলটি খুব লম্বা নয় এবং এখানে হেঁটে বেড়ানো খুবই মনোমুগ্ধকর। সাগরের পার দিয়ে হেঁটে যেতে কার না ভাল লাগে। এই ছোট্ট ট্রেইলের শেষে চোখে পড়বে ছোটখাটো একটি সৈকত। এই স্থানটি আপনার কাছে অনেকটা দ্বীপের মত মনে হতে পারে। তাছাড়াও হেঁটে যেতে চোখে পড়বে বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে নোঙর করা অনেক প্রমোদতরী এবং অপরধারে অনেক আঙ্গুরগাছ। চাইলে সেখান থেকে ফ্রিতে যত ইচ্ছা আঙ্গুর খেতে পারেন। আঙ্গুর গাছের ঝোপে দেখা হয়ে যেতে পারে কিছু বুনো খরগোশদের সাথে। তারাও এই আঙ্গুরগুলোতে ভাগ বসাতে আসবে। এই বিচের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটাও অনেক সুন্দর, যা অনেকটা আমাদের কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের মত। এখানে ড্রাইভিং এর অভিজ্ঞতা হবে খুবই দারুন। রাস্তার অপরপাশে রয়েছে অনেক বাড়িঘর যেখানে সাধারণত শহরের ধনী লোকের বসবাস করেন।

কিটসিলানো বিচ ও ইংলিশ বে

এই দুটি সমুদ্র সৈকত সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার নেই। এই দুটো সমুদ্র সৈকতই ভ্যানকুভার ডাউনটাউন থেকে মাত্র অল্প কিছু দূরত্বে অবস্থিত। এদের মধ্যে ইংলিশ বে স্ট্যানলি পার্কের একেবারেই সন্নিকটে অবস্থিত। এখান থেকে ভ্যানকুভার সী ওয়াল খুবই কাছে যা ফটোগ্রাফারদের জন্য আদর্শ স্থান। শীতকালে যখন সবকিছু বরফে ঢাকা পরে তখন এই স্থানের দৃশ্য একেবারেই অন্যরকম হয়ে যায় এবং তা খুবই মনোমুগ্ধকর। তখন এখানে সবাই তুষার মানব বানানো এবং বরফের বল ছুড়াছুড়ি করে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। গ্রীষ্মকালে সবাই এখানে ঐ একই ধরণের বিচ এক্টিভিটিতে ব্যস্ত থাকে। তবে এখানে দুপুরের দিকে মানুষজনের আনাগোনা একটু বেশি থাকে। ডাউনটাউনের অফিসপাড়া থেকে খুবই কাছে বিধায় সবাই দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে এখানে চলে আসেন কিছুটা শান্ত সময় পার করতে। এই বিচের আশেপাশে অনেক রেস্টুরেন্ট এবং ফুডকোর্ট রয়েছে। সমুদ্র সৈকতের ধারে বসে দুপুরের আহার সেরে নিতে কারই বা ভাল না লাগে বলুন! বিকেলে অনেকই অফিস শেষে এখানে হালকা ইভিনিং ওয়াক করে তারপর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিটসিলানো বিচের পরিবেশও ঐ ধরণের। তবে এখানকার ওয়াকিং ট্রেইলটি ইংলিশ বের চাইতে বেশি সুন্দর। চাইলে এই ট্রেইল ধরে জেরিকো বিচ পর্যন্ত চলে যেতে পারেন। এখানকার মূল বিচ থেকে সামান্য কিছু দূর একটি কোরাল বিচ চোখে পড়বে। এই জায়গাটি অত বড় না হলেও খুবই সুন্দর। এখানে থেকে ভ্যানকুভার জাতীয় জাদুঘরও খুবই স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত। চাইলে এখান থেকে কিছু ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। আর তা না চাইলেও সামনের প্রধান ফটক থেকে ঘুরে আসতে পারেন যেখানে বড় একটি ফোয়ারার মাঝে বিশাল আকৃতির একটি কাঁকড়ার ভাস্কর্য রয়েছে। সেলফি প্রেমীদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান হতে পারে।

ভ্যানকুভার মিউজিয়াম।

ইওনা বিচ স্পিরিট ট্রেইল

রিচমন্ড শহরে অবস্থিত এটি একটি মনোমুগ্ধকর স্থান যা আমার কাছে সবচাইতে ভাল লেগেছে। এখানে আসলে কোন সাগর প্রণালী নয়, একেবারে মূল প্যাসিফিক সাগরকে দুচোখ ভরে দেখতে পাবেন। উত্তাল সাগরের চিরচেনা রূপ শহরের এখানে এসেই দেখতে পারবেন। তবে এখানকার সমুদ্র সৈকত এই স্থানের মূল আকর্ষণ নয়। এখানকার মূল আকর্ষণ হল সাগরের বুক চিরে চলে যাওয়া স্পিরিট ট্রেইল। হ্যাঁ, দূর থেকে দেখলেই এমনই মনে হবে। এই স্পিরিট ট্রেইলের মোট দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। তার মানে হল যে, এই ট্রেইল সম্পূর্ণ করতে হলে আসা যাওয়া নিয়ে মোট ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে পার করতে হবে। এই ট্রেইল সম্পূর্ণ করতে প্রায় দু থেকে আড়াই ঘন্টা সময় লাগতে পারে। আমার ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল প্রায় ১ ঘন্টা ৫০ মিনিটের মত। আপনি চাইলে এই ট্রেইলে সাইক্লিংও করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ট্রেইল পার করতে অনেক কম সময় লাগবে, তবে সেজন্য আপনাকে নিজের সাইকেল সাথে করে নিয়ে আসতে হবে। তবে এখানে হেঁটে যেতেও আপনার খারাপ লাগবার কথা নয়, যদি আপনি প্রকৃতিপ্রেমী হন। সাগরপ্রান্ত থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া আপনাকে সবসময় মুগ্ধ করবে এবং ক্লান্তিহীন রাখবে। আপনি ট্রেইল ধরে হাঁটলে আপনার চোখকে হয়তো বিশ্বাস করবেন না। সাগরের জলস্রোতে প্রসারিত সরু পথটি পার হবার সাথে সাথে আপনি পানির উপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতিটি পেতে পারেন। আপনি হয়তোবা এই স্থানটির সাথে আমাদের দেশের মিঠামইনের সাদৃশ্য খুঁজে বেড়াতে পারেন। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল মিঠামইনের রাস্তাটির অবস্থান হাওড়ের মাঝে যা দুটি গ্রামকে সংযুক্ত করেছে এবং এই ট্রেইলটির অবস্থান সাগরের মাঝামাঝিতে। ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে পুরো ট্রেইলটিকে দেখলে মনে হবে সাগরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা খাঁড়া এক রাস্তা যেন শেষ পর্যন্ত সাগরের মাঝেই মিশে গিয়েছে। এই ট্রেইলের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি জেটি রয়েছে যেখানে মাঝে মাঝে কিছু জাহাজ এবং প্রমোদতরীকে ভিড়তে দেখা যায়। এই স্থানটি ভ্যানকুভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ঠিক পাশেই অবস্থিত যেখানে আপনি চাইলে কিছুক্ষণ প্লেনস্পটিংও করতে পারেন। এখানে আসতে হলে আপনাকে প্রথমে ইওনা বিচ রিজিওনাল পার্কে আসতে হবে। সেখানকার মূল ফটক পার হলেই একটি ছোট্ট সবুজ মাঠ চোখে পড়বে এবং সেখানে আপনি দেখতে পাবেন হাজার খানেক সাদা হাঁসের দল অবাধে বিচরণ করছে। সেখান থেকে কিছু দূর এগোলেই আপনি ট্রেলের রাস্তাটির দেখা পাবেন। এখানে এই স্পিরিট ট্রেইল ছাড়াও ছোট ছোট কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত রয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি স্বল্প দূরত্বের ফরেস্ট ট্রেইলও আছে।

সেই অসাধারণ স্পিরিট ট্রেইল।

এছাড়াও শহরের মাঝে ঘুরে দেখবার মতন অনেক জায়গা আছে। যদি আপনার অবস্থান হয় ডাউনটাউনের কাছাকাছিতে তবে শেষ বিকেলে ঘুরে আসতে পারেন কানাডা প্লেস থেকে। এটি মূলত একটি ছোট নৌবন্দর, যেখানে মাঝে মাঝে কিছু যাত্রীবাহী জাহাজকে নোঙর করতে দেখা যায়। এখানকার কানাডা প্লেস ভবনটিও একটি বিশাল জাহাজের ন্যায় তৈরি করা হয়েছে এবং দূর থেক দেখলে আপনি মনে করতে পারেন কোন জাহাজ ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। শেষ বিকেলে এখানকার ওয়াকিং ট্রেইলে ঘুরে বেড়ানো মন্দ হবে না। এছাড়া ঘুরে আসতে পারেন শহরের গ্যাসটাউন এলাকা থেকে। না এখানে কোন গ্যাসের খনি নেই। এক ব্রিটিশ মেরিন অফিসার জন ডাইটন যার ডাক নাম ছিল “গ্যাসি জ্যাক” এবং তার এই নামানুসারে এই এলাকাটির নাম হয় গ্যাসটাউন। তার এই ডাকনামের পিছনে এক বিশাল কাহিনী আছে যা চাইলে আপনারা ইন্টারনেট সার্চ করে জেনে নিতে পারেন। এই এলাকার মূল আকর্ষণ হল শত বছরের বেশি পুরানো এক বাষ্পচালিত ঘড়ি যা স্রুরু রাস্তার একপাশে দাঁড়ানো আছে। এই ঘড়ি দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষের আগমন হয় এবং অনেকেই এখানে এসে সেলফি তোলেন। সম্পূর্ণ এলাকাটিতে অনেক পুরানো দোকান ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে এবং একে আপনার কাছে ইউরোপের কোন দেশের এলাকা মনে হতে পারে। এছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন চায়না টাউন থেকে, সেখানেও রয়েছে আকর্ষণীয় অনেক কিছু দেখবার মত।

গ্যাসটাউনের সেই বিখ্যাত ঘড়ি।

এই শহরে অনেকগুলো শপিং মল রয়েছে। এর মধ্যে ভ্যানকুভার ডাউন্টাউনে অবস্থিত প্যাসিফিক মল, বার্নাবির মেট্রোটাউন মল, রিচমন্ডের রিচমন্ড সেন্টার এবং চায়না টাউনে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ভিলেজ অন্যতম। আমার নিকট বার্নাবির মেট্রোটাউন শপিং মলটি সবচাইতে ভাল লেগেছে। ডাউনটাউনের প্যাসিফিক সেন্টারও অনেক বড় একটি মল যা পুরোপুরি মাটির নিচে অবস্থিত। আপনি ডাউন টাউনের রাস্তা দিয়ে না হেঁটেও, শপিং মলের ভেতরে হেঁটে ডাউনটাউনের এক স্ট্রিট থেক অন্য স্ট্রিটে পৌঁছতে পারবেন। ভ্যানকুভার শহরে কয়েকটি বাংলাদেশী রেস্তোরাঁও রয়েছে। দেশী রেস্তোরাঁ ছাড়াও এখানে বিভিন্ন দেশের কুসিন রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখান থেকে যেকোন দেশের খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব। বাংলাদেশী এবং এশিয়ান রেস্টুরেন্টগুলোর মূলত পূর্ব ভ্যানকুভারের ফ্রেজার স্ট্রিটে অবস্থান করছে। রেস্টুরেন্ট ছাড়াও এখানে অনেকগুলো দেশী বিদেশি গ্রোসারি শপ এবং সুভেনিয়র শপ রয়েছে।

মেট্রো ভ্যানকুভার শহরে চলাচলের সবচাইতে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় হল পাব্লিক ট্রানজিট ব্যবহার করা এবং মাত্র ১০ ডলার খরচ করলে আপনি একটি ডে পাস পেয়ে যাবেন। ফলে আপনি ঐ দিনে যত খুশি ইচ্ছা ততবার বাস, ট্রেন কিংবা ফেরীতে ভ্রমণ করতে পারবেন। আপনার গন্তব্যের নির্দেশনার জন্য একটি আলাদা মোবাইল ফোন এপ আপনাকে ডাউনলোড করতে হবে, যার মাধ্যমে আপনি সহজে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পেয়ে যাবেন।

মেট্রো ভ্যানকুভার শহরে বলতে গেলে এই স্থানগুলোই উল্লেখযোগ্য। আরও অনেক ঘুরে দেখবার মতন স্থান রয়েছে সেগুলো খুবই অসাধারণ। আমি হয়তোবা এই শহরে লম্বা সময় ধরে থাকবো এবং সুযোগ হলেই অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখবো ও আপনাদের তা সম্পর্কে জানাবো। তবে ভ্যানকুভার শহর নিয়ে এই মূল প্রবন্ধের আজ এখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করছি। আবার কথা হবে অন্যান্য কোন স্থাপনা, ভ্রমণস্থান, ভ্রমণকাহিনী কিংবা ভ্রমণ বিষয়ক অন্যান্য কিছু নিয়ে। তবে যেখানেই ভ্রমণ করুন না কেন সবসময় খেয়াল রাখবেন আপনার জন্য পরিবেশ যাতে নোংরা না হয়। পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের সর্বদা সচেতন থাকা উচিত।

সবাই ভাল থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন এবং নিজ নিজ অবস্থানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন।

So, travel more & be happy. Always remember that your mobility is your freedom.

ছবিসূত্রঃ নিজস্ব ধারণকৃত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s