লকডাউন- এ যেন অন্য রকম এক বিশ্ব।

আজ আমি আমার অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য সবার অভিজ্ঞতাকে আপনাদের নিকট তুলে ধরবো। আপনারা সবাই জানেন যে, সারা দুনিয়া করোনা ভাইরাসের প্রকোপে আক্রান্ত। এটা বলতে গেলে ভয়াবহ একটা মহামারির আকার ধারণ করছে বলা চলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে এক মহামারি বলে ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়েছে, তবে দৃশ্যত তা এতটা ভয়াবহ নয় যতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এটা ইতালি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে। এর উৎপত্তি স্থল চীন থেকে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে সমস্ত মহাদেশে ইহা এখন প্রাণনাশের আতংক ছড়াচ্ছে। নতুন করে কিছুই বলার নেই, আপনারা সবাই তা জানেন। চীনের উহান শহরে যখন এর উৎপত্তি হয়, তখন সেই শহরের অবস্থা যা হয়েছিল সেখান থেকেই লকডাউন পরিস্থিতির সৃষ্টি। সেখানকার লোকজন প্রায় মাসের বেশি আবদ্ধ অবস্থায় থেকেছিল। সেখানকার ডাক্তারেরা এই ভাইরাসকে এত ভয়াবহ অবস্থায় দেখেছিল এবং এর সংক্রমণ যেভাবে দেখেছিল যে শুনেছি, এক ডাক্তার এক কোয়ারেন্টাইন সেলে তার মোবাইল ফোন রেখে চলে এসেছিল সে তা আর ওখান থেকে নিয়ে আসেনি। উহানের মানব জীবন প্রায় দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল।

Wuhan

চীনের উহান শহর। যেখান থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। ছবিসূত্র – Independent.Co.UK।

উহান শহরের লকডাউন পরিস্থিতি। সৌজন্যে – CGTN।

আমার লকডাউনের অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবার আগে আমি শেয়ার করছি আমার দু বন্ধুর কথা ও তাদের বর্তমান পরিস্থিতির কথা। তারা দুজনেই এই মুহূর্তে ইতালিতে বসবাস করছেন। তাদের সাথে আমার সবসময় যোগাযোগ ছিল না। এই বর্তমান সময়ে যা হয়,  সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যাস্ত এই আরকি। যা খোঁজ খবর তা সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে। এদের মধ্যে একজন ফ্লোরেন্স শহরে ৪ বছর যাবত বসবাস করছেন। ইতালি অবস্থা ভয়াবহ দেখে মনে হল যে, তাদের খোঁজ নেই। একজনকে ফেসবুকে কল করলাম। তার অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেই সে কেঁদে উঠলো। বলে যে, এভাবে আর ভাল লাগে ৪ সপ্তাহ ধরে আটক পুরো দেশ লকডাউন। না পারছি কাজে যেতে, না পারছি কোথাও কিছু কিনতে। খাবারের সংকট। স্টোরগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। সারাক্ষণ চিন্তা মাথায়। রাস্তায় কেউ নেই। নেই কোন গাড়ি। একেকটা এ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন যেন মনের ভিতর কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। দিয়ে যাচ্ছে কোন মৃত্যু বার্তা। কি বলে যে তাকে শান্ত করবো তা বুঝতে পারছিলাম না। জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, দেশে ফেরত যাবার চেষ্টা করেছিলি নাকি। সে বললো যে, নাহ। সে যেতে চায় না কারণ, যদি এই ভাইরাস তার মাঝে থাকে তবে বাংলাদেশে এটা ছড়ালে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। দেশে মা বাবা আছে, পরিবার পরিজন আছে। কিন্তু তারাও সবাই চিন্তিত খুবই। তাকে কোনমত আল্লাহ্‌ ভরসা বলে বিদায় নিলাম। ইতালির আরেক বন্ধুকে ফোন দিলাম, সে রোমে থাকে। সে অতটা ভেঙে পড়েনি। সে বললো যে, কি আর করা সবই ভাগ্য। তারও  সেই একই অবস্থা। ৪ সপ্তাহ যাবত গৃহবন্দী। তবে সে আফসোস করে বললো যে, অফিসের কাজে কিছুদিন আগেই লোম্বারডিয়া শহরে গিয়েছিল সে। কাজের ফাঁকে সে শহরটা ঘুরে দেখেছিল, খুবই সুন্দর এক শহর। কিন্তু এই শহর এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি লোক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। একমাত্র হাসপাতালগুলো ছাড়া কিছুই খোলা নেই সবই বন্ধ। সে বললো যে, এখানকার পরিবেশ কেউ এখন না দেখলে বুঝবে না। রাস্তায় একজন আরেকজনকে দেখলেই ১০০ হাত দূরে সরে যায়। মনে হচ্ছে যে, আকাশে বাতাসে ভাইরাস এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে দেশে আসবার জন্য টিকিটও কনফার্ম করেছিল। কিন্তু যাত্রার কয়েকদিন আগে তার এলাকার এক বাঙালি ভাইয়ের ভাইরাস ধরা পরে। যার ফলে সে দেশে আসার ঝুঁকি নেয় নি।

ইতালির বর্তমান অবস্থা। ছবিসূত্র – Independent.Co.UK।

ইতালির লোম্বারডিয়া শহরের বর্তমান দৃশ্য, যা এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সৌজন্যে – NBC News।

ইতালি থেকে চলে যাই এখন সৌদি আরবে। মক্কায় মাসজিদুল হারামের পাশে আমার এক চাচা একটা রেস্টুরেন্ট চালায়। তাকে একবার ফোন দিলাম। সে প্রথমেই বলে উঠলো যে, বাবা সবই আল্লাহর গজব। কিয়ামতের আলামত। ৩০ বছর ধরে এখানে আছি। কিন্তু কাবা শরীফের এমন দৃশ্য আগে কখনই দেখিনি। সম্পূর্ণ মসজিদ প্রাঙ্গণ খালি! তিনি বলেন যে, হাদিসে নাকি আছে যে উমরা বন্ধ হওয়া খুব দ্রুতই হজ্জ্ব বন্ধ হওয়ার আলামত। হজ্জ্ব বন্ধ হওয়া কিয়ামতের গ্রিন সিগন্যাল। ঐখানকার অবস্থা সম্পর্কে জানান যে, মক্কা শহরে কিছুদিন আগে কয়েকজন রোগী সনাক্ত হবার পর এখন শহরে প্রায় সব কিছুই বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ব্যবসা বানিজ্যের অবস্থা তো খারাপ তখন থেকেই যখন উমরা হজ্ব বন্ধ। এখন অবস্থা আরও শোচনীয়।

Mecca1Mecca2

পবিত্র মক্কা শরীফের বর্তমান পরিস্থিতি। ছবিসূত্র – Independent.Co.UK।

গত বছর মালোয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতে সোলো ট্যুর দিয়েছিলাম। খুবই দারুন ছিল মুহূর্তগুলো। ইন্দোনেশিয়ার একজন ট্যুর গাইড বললেন যে, আমাদের জন্যে প্রার্থনা করুন, এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। আর আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য হচ্ছে না। আমরা নিরুপায়। অবস্থা ঠিক হলে আবার আপনারা বেড়াতে আসবেন। মালয়েশিয়াতে একজন পরিচিত টুর গাইডের সাথে কথা বললাম। উনি বললেন যে, আমাদের এখানে আচানক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। অনেক বিদেশী এখানে আটক আছে। তারা কোন ভাবেই যেতে পারছেন না। আমার বাসাতে ৩ জনকে সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের সবার জন্য দোয়া করবেন।

এখন আসি আমার অভিজ্ঞতার কথায়। আমি কানাডার এডমন্টন শহরে গত ২ মাস যাবত বসবাস করছি। সবকিছুই ঠিকঠাক, কিন্তু কিছুদিন আগে আমার খাবারের স্টক শেষ হয়ে যায়। যাই হোক কাজের ব্যস্ততার কারণে কয়েকদিন যাবত রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া করতেছিলাম, কিন্তু সেদিন যখন আমি ওয়ালমার্টে গ্রোসারি শপিং করতে যাই, তখন যে চিত্র দেখলাম তা আসলে কল্পনার বাহিরে। গ্রোসারি ফুড সেকশনে সব শেল্ফ খালি! কিচ্ছু নাই। যদিও কয়েকদিন যাবত শুনে আসছিলাম যে, মাস্ক, হ্যান্ড সেনিটাইজার, টয়লেট পেপার ইত্যাদি কোথাও নেই, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু খাবারের অভাব কখন দেখা দিল? চাল, ডাল ইত্যাদি আমদানি অনেক আগেই বন্ধ ছিল কিন্তু ব্রেড শেল্ফে কোন ব্রেড নেই, ড্রাই ফুড শেল্ফে কোন চিপসও নেই! যাই হোক তলানি থাকা যেই জিনিসগুলো পেলাম তাই কিনলাম। এখান থেকে রওনা হলাম ওয়েস্ট এডমন্টন মল যা উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ মল, যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে প্রায় ৫ গুন বড় শপিং মলে। কিছুদিন আগে তা নিয়ে একটি ব্লগ লিখেছিলাম।  সেখানে গিয়ে দেখি চোখ কপালে! মানুষ যেখানে গিজগিজ করতো সেখানে কোন গুটি কয়েক হতাশ বিক্রেতা ছাড়া অন্য কোন মানুষ নেই। ঐখানকার গ্রোসারি স্টোরগুলোরও ফুড শেল্ফ খালি! আমিতো বুঝলাম না ব্যাপারটা কি? পরে ঐ সময় আমার দুলাভাই আমেরিকা থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায় যে, কানাডার ফার্স্ট লেডি গ্রেগরিয়া ট্রুডো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আমি ব্যাপারটা সেদিন এই প্রথম জানতে পাই। কয়েকজন লোকালদের জিজ্ঞাসা করলাম তারাও ব্যাপারটা নিশ্চিত করলো, পাশাপাশি জাস্টিন ট্রুডোও সেলফ কোয়ারেন্টাইনে। গ্রোসারি স্টোরের বিক্রেতারা জানায় এই খবর বের হবার প্রায় ২ থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যে সব ফুড আইটেম খতম হয়ে যায়। কি আর করা ঐখানে তলানি যা ছিল তাই কিনলাম।

Walmart

ওয়ালমার্টের খালি ফুড শেল্ফ।

জনশূন্য ওয়েস্ট এডমন্টন মল। ছবি- নিজ ধারণকৃত।

সেদিন আমার পকেট ভর্তি টাকা ছিল। সেই মুহূর্তে চাইলে আমি আমি পুরো ওয়ালমার্টের জিনিস কিনে ফেলতে পারতাম। কিন্তু যা কিনেছি তা দিয়ে সপ্তাহ খানেক চলতে পারবো কিনা সন্দেহ। যেই মানুষ আমি কিছুদিন আগে ওয়েস্ট এডমন্টন মল থেকে ৩০০ ডলার খরচ করে একটা স্টাইলিস্ট জ্যাকেট কিনেছিলাম, সেই মানুষ আজ শপিং মলের টয়লেট থেক টয়লেট পেপার অনেকগুলো কালেক্ট করে নিয়ে এসেছি। শধু তাই নয় সেখানকার ডিস্পেন্সারিতে রাখা হ্যান্ড সেনিটাইজারও ছোট একটা বোতলে ভরে নিয়ে এসেছি। আর স্টারবাক্স ও অন্যান্য ক্যাফেতে ডিস্পেন্সারিতে রাখা টিস্যু পেপার, চিনির প্যাকেট, লবনের প্যাকেট কিছুই বাই রাখিনি, স্টক ভর্তি করে নিয়ে বাসায় এসেছি। কিছুদিন আগেও আমার এক কাজিনের কর্মকান্ড দেখে হাসাহাসি করতাম, সে যেখানে যাইতো টিস্যু পেপার সেখান থেকে একগাদা নিয়ে এসে স্টকে জমা রাখতো। আজ আমিও সেই পন্থা অবলম্বন করছি। শিক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, মানুষ পরিস্থিতির কাছে কত অসহায়। যখন একটা পরিস্থিতি এমনই প্রতিকূল থাকে যে, অঢেল টাকা পয়সাতেও কোন কাজ হয়না। করোনা ভাইরাসের প্রভাব তারই উদাহরণ। যার টাকা আছে সেও মরবে, যার টাকা নাই সেও মরবে। যার ভাগ্য ভাল থাকবে সেই বেঁচে যাবে। তাই দুনিয়াতে টাকা-পয়সা,অর্থ-সম্পত্তি সবকিছুই না। যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল মানবিকতা আর আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা।

এখন আমি প্রায় ৪ দিন যাবত গৃহ বন্দি অবস্থায় আছি। এই কয়েকটা দিন আমার সকল স্বাভাবিক কর্মকান্ড বন্ধ। যতটুকু পেরেছি খাবার স্টক করে রেখেছি। জানিনা পরে কি হবে। সমস্ত কানাডা এখন লকডাউন অবস্থায় আছে। কোথাও কোন লোক নেই। সবাই নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। আমার যদি এই ৪ দিনে এই অবস্থা হয় তবে, যারা ইতালিতে অবস্থান করছেন তাদের অবস্থা কি! মনে হলে খুবই কষ্ট লাগে। এরকম যদি খুব বেশিদিন চলে তবে, করোনা ভাইরাস নয় এমনিতেই পাগল হয়ে মারা যাব। কারণ, আমি ঘরে বন্দি থাকার মানুষ নই।

90388903_3203059556370755_8506565638947340288_o

গৃহ বন্দি অবস্থায় আমি। জানালার বাহিরে দেখছি বাকি দুনিয়া। ছবি- নিজ ধারণকৃত।

কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন, যা এখান থেকে যতটুকু দেখলাম। স্কুল কলেজ ছুটি হবার কারণে, সবাই কক্সবাজার বেড়াতে যাচ্ছেন। খালি সরকারের দোষ, এদেশের মানুষ যে কতটা ইররেস্পন্সিবল তা তো আমাদের জানা নেই। আমরা আসলেই জাতি হিসেবে খুবই উদাসীন। যখন হাজার হাজার লোককে গণকবরে যেতে দেখবে তখনও সবার হুশ হবে না। বাংলাদেশের মানুষ এই ব্যাপারে ড্যাম কেয়ার। বিদেশ ফেরত লোকজন অবাধে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিছুই বলার নেই। একেক ডাক্তার এক রকমের থিওরী দিচ্ছেন। কেউ বলছেন তাপমাত্রার কথা। আর কেউ কেউ তুলনা করছেন সড়ক দুর্ঘটনার সাথে। কত একটা জঘন্য ও হাস্যকর তুলনা। পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য সড়ক দুর্ঘটনায় ও একসাথে ১০ জনের বেশী লোককে আইসিইউতে নেয়া লাগবেনা। পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হিমশিম খাওয়া দূরের কথা। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে ঘটনা উল্টো। ১জন আক্রান্ত হওয়া মানে চক্রবৃদ্ধি হারে আরও শতশত মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। কোথায় ভাইরাস পড়ে আছে কে জানে? দরজার হাতলে নাকি লিফটের বাটনে নাকি জামার হাতায়? ? কেউ জানেনা কোথায় এই শত্রু লুকিয়ে আছে। যারা এ ব্যাপারটাকে কোন গুরুত্বই দিচ্ছেন না তারা কি জানেন যে, ইতালির মত অবস্থা যদি এদেশে হয় তো কি হবে? আবহাওয়া এখানে খুবই একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। দেশের চারপাশের পরিবেশ খুবই নোংরা, এখান থেকে ছড়াতে বেশি একটা সময় লাগবে না। ঢাকা শহরের অবস্থাই দেখুন কি হতে পারে।

এ ছিল আমাদের দেশে করোনা পরিস্থিতি। সবাই উদাসীন।

এখানকার সরকার ও উপর মহলের লোকজনও অনেক উদাসীন। যাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে প্রেরণ করেছেন তারা কেন অবাধে ঘুরাঘুরি করছেন? তদারকিটা করবে কে? এয়ারপোর্টে কেন এরকম দুর্নীতি হচ্ছে? আপনারা কি জানেনে যে, এসব কিছুর ফলাফল আপনাদেরও ভোগ করতে হবে। উপর মহলের লোকজন তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য কোথায় যাবেন? সিংগাপুর, মালয়েশিয়া নাকি ইতালি?

আমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করি না। আমি চিন্তা করছি আমার বাবা-মাকে নিয়ে, কারণ তাদের বয়স বেশি, তাদের এই করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিও বেশি। তাই আমি এই দেশে সহসা আসছি না, এমনকি পরিস্থিতি খুবই খারাপ হলেও না, জীবন গেলেও না। যদি না কানাডার সরকার আমাকে জোর করে গলাধাক্কা দিয়ে বের না করে দেয়, তবে এদেশের সরকার কখনই এটা করবে না। যারা প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন তাদেরও বাবা-মা আছেন, পরিবার পরিজন আছেন, উনারা তাদের জন্যই বিদেশে কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করছেন। আপনারা যদি তাদেরকে প্রকৃত অর্থে ভালবাসেন বা তাদের কথা চিন্তা করেন তবে প্লিজ আপনারা নিজেদের জায়গায় অবস্থান করুন। প্লিজ এখন এদেশে আসবেন না, অতি প্রয়োজন ব্যাতীত। আপনারা যদি সেখানে সর্বচ্চো সতর্কতা অবলম্বন করেন তবে, সেখানেই আপনার বেঁচে যাবার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশে এসে যদি ধরা পরেন তবে, এখানে মৃত্যুঝুঁকি খুবই বেশি। কারণ ইতালির কথাই ধরুন, যে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কত উন্নত এমনকি কানাডার চাইতেও উন্নত সেখানে কি অবস্থা হয়েছে। এখন শুনেছি ৮০ বছরের উপরের আক্রান্ত লোকদের আইসিইউতে না নিয়ে মৃত্যুর জন্য ঠেলে দিচ্ছে। কারণ সেখানে জিনিসটা খুবই ভয়াবহ আকারে ছড়িয়েছে বলে। ভেবে দেখুন যদি এদেশে এই অবস্থা হয় তাহলে কি হবে? আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কি তা তো আমরা সকলেই জানি। আইসিইউ তো দূরের কথা মানুষ তো সব ঘরে শুয়ে শুয়েই মারা যাবে। আর এই রোগ এমন যে, সনাক্ত হতেই ২ সপ্তাহ লেগে যায়। তাহলে তো কোন নিশ্চয়তা নেই যে, আপনার শরীরে এই রোগর জীবানু একদমই নেই। তাই আপনাদের দেশে আসা মানেই অনেকটা দেশে আত্মঘাতী বোমা হামলার মত। আপনি নিজেও মরবেন আপনার পরিবার ও আশে-পাশের লোকজনদেরও মারবেন। কি লাভ হবে তখন? আর যদি জরুরি প্রয়োজনে আসতেই হয় তবে, নিজ দায়িত্বে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলুন। দয়া করে এদিক সেদিক ঘুরতে বের হবেন না।

গল্পটা আরেকটু বর্ণনা করে শেষ করি। সেদিন শপিং শেষে চলে গেলাম এক রেস্টুরেন্টে ভালমন্দ খাওয়া দাওয়া করবো বলে। রেস্টুরেন্টগুলোতে গিয়েও চোখ দুটো একেবারে উঠে গেল চড়ক গাছে। সেখানকার মেনুর কোন আইটেমই এভেইলেবল না গুটি কয়েক ড্রাই ফুড আইটেম ও ড্রিংকস ছাড়া। বিক্রেতাদের ভাষ্য যে, তাদের এখানে কয়েকদিন যাবত কোন ধরণের সাপ্লাই আসছে না। কি আর করা যা ছিল তাই খেলাম। এখানে একটা জিনিস বলে রাখা ভাল যে, কোন কিছুর দাম বেশি রাখা হচ্ছে না বাংলাদেশে যেটা হয় আরকি। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে জ্যাস্পার এভিনিউতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম উবারের জন্য। জ্যাস্পার এভিনিউ হচ্ছে এডমন্টন শহরের প্রাণকেন্দ্র যেখানে সবসময় মানুষের ভিড় থাকে এবং আজ সকালেও যথেষ্ঠ ভিড় ছিল। সেখানে দেখি মানুষ গুটিকয়েক তো দূরের কথা কোন মাছিও নাই। অনেকটা শহরে কারফিউ লাগার মত। মনে হয়ে গেল ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার কথা, সেই সময় ঢাকার অবস্থা যেমন ছিল। অবশেষে উবারে উঠে বাড়ির পথে রওনা। উবার ড্রাইভারের সাথে কিছু কথা হল করোনা ভাইরাসের বিষয় নিয়ে। কথা বলাবলির এক পর্যায়ে উনি বলে উঠলেন যে, ” Is this the end of the world?”। জবাবে আমি বললাম, “Not yet. I don’t think so.”। তবে তখন একটা হলিউড মুভির কথা মনে পড়লো যার নাম আমার মনে আসছে না। মুভির কাহিনী এই ছিল যে, কোন এক পাগল সাইন্টিস্ট এক ভাইরাস আবিষ্কার করে দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয় এবং সে অবশ্য নিজেও আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এই মুভিটা শেষ হয়েছিল একটা প্রশ্নের মাধ্যমে সেটা হল যে, Is this the end of the world?”।

img_0344

আচানক ভিড়শূন্য জ্যাস্পার এভিনিউ। ছবি- নিজ ধারণকৃত।

img_0536

প্রায় জনশূন্য এক পাব্লিক বাস। ছবি- নিজ ধারণকৃত।

নাহ, আমার মনে হয় না যে, কোন মানুষ এই ভাইরাস আবিষ্কার করছে। এটা এক আল্লাহর গজব ছাড়া কিছু নয়। তবে আমি মনে প্রাণে চাই এবং প্রার্থনা করি যে, জলদি এর প্রতিরোধক ব্যবস্থা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হোক। নাহলে, মানুষের মৃত্যুহারের চেয়েও যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে সেটা হল মানবিকতার বিপর্যয়, মনুষ্যত্বের বিপর্যয়। তখন কেউ কারোর সাথে ভাব আদান প্রদান করবে না। এক আরেকজনের সাথে কথা বলবে না। কারোর কোন বন্ধু থাকবে না। সবাই তখন নিজেকে নিয়েই চিন্তা করবে এবং নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যদের হত্যা করতে পিছপা হবে না। মানুষ হয়তো অনেক বেঁচে থাকবে কিন্তু মনুষ্যত্ব থাকবে না। আর তখনই হবে, “The end of the world.”।

আজ আমি এ কথা বলে শেষ করবো না যে, “Travel more & be happy. Always remember that your mobility is your freedom.”। একথা বলার সময় এটা নয়। সবাই ভাল থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন এবং নিজ নিজ অবস্থানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s